'অচেনা যাত্রী'র জুন সংখ্যায় প্রকাশিত আমার লেখা প্রবন্ধ:
২৭ এর প্রজন্ম: ফ্ল্যাশব্যাক
মৈনাক আদক
কয়েকদিন
আগে স্পেনের মুরসিয়াবাসী কবিবন্ধু পাবলো মার্তিনেসের সাথে অনলাইনে আড্ডা দিতে দিতে
প্রসঙ্গক্রমে উঠে এল সাহিত্যের স্বর্ণযুগ এবং বিশেষ কবিদলের কথকতা ও প্রভাব। স্পেনীয় সাহিত্যের ইতিহাসে মুরসিয়া, মালাগা, মোগেরসহ
বৃহৎ আন্দালুসিয়ার গুরুত্বের তুলনা হতে পারে
স্বাধীনতার লড়াইয়ের সময় বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টির প্রাচুর্যের সাথে ও কবিদের কবিতায়-গানে-নাটকে
সাম্রাজ্যবাদের কদর্যতার ভারে নুইয়ে পড়া সাধারণ নাগরিকমানসে নতুন করে বেঁচে থাকার ঐক্যবদ্ধ
লড়াইয়ের সাথে। ২৭ এর প্রজন্ম স্পেনীয়
সাহিত্যের ইতিহাসে দ্বিতীয় স্বর্ণযুগের রূপকার। আসলে ১৯২৩ থেকেই বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে
ছিটিয়ে থাকা স্পেনের কবি ও চিত্রকরেরা 'আভাঁ-গার্দ' ফর্ম নিয়ে একসাথে কাজ করার জন্য
সলতে পাকানো শুরু করলেন। স্বর্ণযুগের বারোক কবি লুইস-দে-গোঙ্গোরার মৃত্যুর ৩০০ বছর
উপলক্ষে ২৭ এর প্রজন্মের কবিরা ১৯২৭এ প্রথম আনুষ্ঠানিক
বৈঠক করলেন সেভিয়ায়।
প্রবীণ ও
নবীন সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ১৬ই ডিসেম্বর গোঙ্গোরার প্রতি শ্রদ্ধার্পণ
করলেন আতেনেয়ো দে সেভিয়া লাইব্রেরীতে, যে লাইব্রেরী আজ মহৎ দ্রষ্টব্য এক মিউজিয়াম।
এই শ্রদ্ধার্পণ উৎসবই সূচনা করল ২৭ এর প্রজন্মের।
এই দল আরও
বেশ কিছু নামে পরিচিত ছিল: "প্রজাতান্ত্রিক প্রজন্ম", "একনায়কতন্ত্রের
প্রজন্ম", "২৫এর প্রজন্ম"( কাকতালীয়ভাবে ২৭ এর প্রজন্মের বেশিরভাগ কবির প্রথম কাব্যগ্রন্হ বেরোয় ১৯২৫এ),
''আভাঁ-গার্দ প্রজন্ম", "বন্ধুত্বের প্রজন্ম" এবং "গিয়েন-লোরকা
প্রজন্ম"( কারণ, এই দলের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য ছিলেন খোর্খে গিয়েন এবং সবচেয়ে নবীন
সদস্য ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা)। দলের বাকি আটজন সদস্য ছিলেন কবি
পেদ্রো সালিনাস,
রাফায়েল আলবের্তি, দামাসো আলোনসো, খেরার্দো দিয়েগো, লুইস সেরনুদা, ভিসেন্তে আলেইসান্দ্রে,
মানুয়েল আল্তোলাগিররে এবং এমিলিও প্রাদোস। এছাড়াও মিগেল এরনানদেস, লেওন ফেলিপের মতো প্রথিতযশা কবিরাও ২৭ এর দলের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। নোবেলজয়ী কবি হুয়ান রামোন হিমেনেথ প্রথমদিকে
নিয়মিত সংবাদপত্রে ২৭ এর দলের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করলেও ১৯৩০এর
দিকে বিরোধ ভুলে দলে যোগদান করেন। ২৭ এর দলে কবিরা জোট বাঁধা শুরু করলেও কিছুদিন
পরে যোগ দিলেন লুই বুনুয়েল, সুররেয়ালিস্ত চিত্রশিল্পী সালভাদোর দালি, ওস্কার দোমিঙ্গেস,
ভাস্কর মারুখা মাইয়ো প্রমুখ। স্পেনে ২৭ এর দলের জন্ম হলেও তাঁদের সব লেখা এস্পানিওল
ভাষায় প্রকাশিত হয়নি, দালি ও দোমিঙ্গেস ২৭ এর দলের হয়ে ফরাসী ভাষায় অমূল্য কিছু
প্রবন্ধ লিখলেন। দূর থেকে হলেও চিলে থেকে পাবলো নেরুদা, ভিসেন্তে উইদোব্রো এবং আর্হেন্তিনা
থেকে হোর্হে লুইস বোর্হেস ২৭ এর চিরনবীনদের অভিবাদন জানালেন, এসে পড়লেন
সমকালীন স্পেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি আন্তোনিও মাচাদো। মাদ্রিদ শিল্প সংস্কৃতির রাজধানী হলেও ২৭ এর দলের রাজধানী হয়ে উঠল তাঁদের আঁতুরঘর দক্ষিণের প্রাণোচ্ছল নগরী সেভিয়াই,
কারণ বেশিরভাগ কবির বাস সেভিয়া তার কাছাকাছি মালাগা, মুরসিয়া, আর তেনেরিফেতে।
তাই ২৭ এর দলের মুখপত্রগুলিও প্রকাশিত হত এইসব শহর থেকেই: সেভিয়া থেকে বেরোতো 'মেদিওদিয়া',
তেনেরিফে থেকে 'গেসেতা দে আর্তে', মালাগা থেকে 'লিতোরাল'।
২৭ এর কবিদের লেখনির বৈচিত্রের জন্য তাঁদের লেখার নির্দিষ্ট কোনো ধাঁচ দেখা যায়
না, প্রত্যেকেই তাঁদের স্বকীয়তা নিয়ে ১৯২৫এর মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত কবি হয়ে উঠেছিলেন, যেমন
লোরকা ও আলবের্তি ছিলেন নিও-ফোকলোরের পদানুসারী, তাঁদের লেখায় আন্দালুসিয় লোককথার স্পষ্ট
প্রভাব, লোরকা তো পাঠকের কাছে 'চারণকবি' হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
খোর্খে গিয়েন
ও পেদ্রো সালিনাস ছিলেন স্পেনীয় ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক এবং তাঁরা একসাথে লিখতে পছন্দ
করতেন। তাঁদের কবিতায় নৈরাশ্যবাদ সরিয়ে আশাবাদের দর্শন সর্বত্র দেখা যায়। আলবের্তি
প্রথম জীবনে প্রেমের কবিতাকে অমরত্ব দিয়েছিলেন, ১৯৩৬এ স্পেনীয় গৃহযুদ্ধে সাধারণ মানুষের
হয়ে হাতে বন্দুক তুলে নিলেন আর তারপর রাজনৈতিক কবিতাকেও পৌছে দিলেন আন্দালুসিয় ক্ষেতখামার
থেকে পিরেনের চূড়ায়। আবার সুররেয়ালিস্ত কবি ভিসেন্তে আলেইসান্দ্রে ও সেরনুদার লেখায়
সুররেয়ালিজমের স্পষ্ট প্রভাব। এদের সবার শিক্ষক ছিলেন কবি হুয়ান রামোন হিমেনেথ যাঁর
লেখায় আন্দালুসিয় নিসর্গজগৎ আর তুচ্ছাতিতুচ্ছ মানুষের মনের অন্তঃপুরের ছবি। আশ্চর্য
মিল তাঁর সাথে রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যদৃষ্টিতে, নিসর্গের প্রতি আকর্ষণে, জীবনের রহস্যের
প্রতি আসক্তিতে। কিন্তু তাঁদের সবার লেখার মধ্যেই বৈশিষ্ট্যগত কিছু সাযুজ্য ছিল: মেধা
ও ভাবালুতার নিখুঁত ভারসাম্য, রোমান্টিক ও ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের পাশাপাশি উপস্থিতি,
নান্দনিকতা ও মানব সত্যতার ভারসাম্য, বিশ্বসাহিত্য ও স্পেনীয় সাহিত্যের দ্বন্দ্ব, ঐতিহ্য
ও সংস্কারের ভারসাম্য এবং লোকসঙ্গীতের মূর্ছনা।
১৯৩৬এ স্পেনে
গৃহযুদ্ধ শুরু হতেই ২৭ এর নবীন কবিরাও বন্দুক নিয়ে সাধারণ মানুষের
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করলেন একনায়ক জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে। তাঁদের আহ্বানে
সাড়া দিয়ে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, আমরিকা ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের কবিরা অনেকেই
এই যুদ্ধে যোগ দিলেন। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধে পোক্ত ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে কবিরা পেরে উঠলেন
না। ভেঙে পড়ল স্পেনীয় সাহিত্যের ইতিহাসের কবিতার স্বর্ণযুগের যৌথখামার।
১৯৩৬এ ১৯শে
আগস্ট কাকভোরে ফ্রাঙ্কোর সাঙ্গোপাঙ্গোরা লোরকাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে চার বন্ধুর সাথে
গুলি করে হত্যা করে গ্রানাদায় গোপনে কবর দিয়ে দেয়, সেই রহস্যের আজও কোনো কিনারা হয়নি।
মিগেল এরনানদেসের মৃত্যু হল যক্ষায়, জেলের মধ্যে। আলবের্তি, সালিনাস, সেরনুদা, খোসে
বেরগামিন, লেওন ফেলিপে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে
গেলেন এবং পরস্পরের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চললেন। আন্তোনিও মাচাদোও মারা গেলেন জেলেই,
স্লো-পয়জনে মারা হয়েছে তাঁকে এরকম কথাও শোনা গেছে। হুয়ান রামোন হিমেনেথ পুয়ের্তো রিকোয়
শিক্ষকতায় চাকরী নিয়ে চলে গেলেন, ১৯৫৫ পর্যন্ত থাকলেন এবং ঐসময়ে স্ত্রী সেনোবিয়া কামপ্রুবির
সহায়তায় রবীন্দ্রনাথের ছোটদের জন্য লেখা গল্প
ও কবিতার একটি দীর্ঘ সংকলন অনুবাদ করলেন। দামাসো আলোনসো ও খেরার্দো দিয়েগো জেনারেল
ফ্রাঙ্কোর কাছে প্রায় বশ্যতা স্বীকার করে স্পেনেই থেকে গেলেন এবং ৫০ এর প্রজন্মের কবিতা
আন্দোলনে নতুন কবিদের পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। আলেইসান্দ্রে নিজের দেশেই স্বেচ্ছানির্বাসনে
রয়ে গেলেন এবং ৫০ এর প্রজন্মের কবিদের সাথে লিখে চললেন। ১৯৭৭এ নোবেল পুরস্কার নিয়ে
মঞ্চে তিনি বলেছিলেন: "আমার এই নোবেলপ্রাপ্তির কৃতিত্ব আমার একার নয়। এ পুরস্কারও
আমার একার নয়। এ পুরস্কার ২৭ এর প্রজন্মের সকল
কবির পুরস্কার। আমি তাঁদের হয়েই নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করলাম।"
২৭ এর কবিদের কিছু কবিতা:
সৈকত: পেদ্রো সালিনাস
যদি না যেতো
অন্বেষণে
দুর্বল,
ছোট্ট, দুধসাদা গোলাপের
অনেক দূরের
আহ্বান তার
কে যেন বলেছিল
আমায়
তখনও তার
শ্বাস পড়ছিল
তখনও সে
জীবিত
ভেতরে তখনও
তার উদ্দীপনা
সে চেয়েছিল
সমগ্র পৃথিবী
সুনীল, প্রশান্ত,
জুলাইয়ের সাগর?
তার সাথে: রাফায়েল আলবের্তি
ডিঙি ভাসাবো,
বন্দর থেকে কাকভোরে
পালোস দে
মোগেরের পানে
দাঁড়হীন
খেয়াতরীর ওপর
একা, রাতভোর,
সাগরে!
বাতাস আর
তোমার সান্নিধ্য
তোমার কৃষ্ণঘন
শ্মশ্রু
আমি তো অজাতশ্মশ্রু
কৈশোর: ভিসেন্তে আলেইসান্দ্রে
আসতে-যেতে
তুমি
এ পথে সে
পথে
কখনো দেখতাম
কখনো পথ
ধূধূ
সাঁকো থেকে
সাঁকোয় হেঁটে যেতে
দৃঢ় পদক্ষেপে
পড়ন্ত আলোয়
হাসিখুশি
হে কিশোর,
দেখতাম
জলের উচ্ছল
স্রোত
আয়নায় তোমার
চলে যাওয়া
বাধাহীন
বহতা, দূরে বিবর্ণ মিলিয়ে যাওয়া।
গরম কফি: ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা
ক্রিস্টালের
আলো
আর সবুজ
আয়না।
অন্ধকার
মাচায়
পাররালা
কথা
চালিয়ে যায়
মৃত্যুর
সঙ্গে।
মৃত্যুকে
ডাকে
সে আসে না।
আবার ডাকে
লোকে কাঁদতে
চায়
আর সবুজ
আয়নায়,
সারিবদ্ধ
প্রজাপতি
উড়ে যায়।
* কবিতাগুলি
মূল এস্পানিওল থেকে অনুবাদ করেছেন প্রবন্ধকার।
তথ্যসূত্র:
১) এল ভেইনতিসিয়েতে
কোমো খেনেরাসিওন ( ১৯৭৮): খুয়ান মানুয়েল রোসাস
২) খেনেরাসিওন
দে ভেইনতিসিঙ্কো ( ১৯৫৭): লুইস সেরনুদা
৩) পানোরামা
ক্রিতিকো দে লা খেনেরাসিওন দে ভেইনতিসিয়েতে ( ১৯৮৭): দিয়েস দে রেভেঙ্গা
৪) লা পোয়েসিয়া
দে লা খেনেরাসিওন দে ভেইনতিসিয়েতে ( ১৯৭০): খোসে লুইস কানো
৫) এল লেঙ্গুয়াখে
পোয়েতিকো দে লা খেনেরাসিওন গিয়ন-লোরকা ( ১৯৫৪):
খোয়াকিন গোনসালেস মুয়েলা
No comments:
Post a Comment