Saturday, 12 July 2014

পেরুর কবিতা, আমার অনুবাদ

সম্প্রতি 'সাপ্তাহিক অন্যনিষাদ' পত্রিকায় প্রকাশিত হল পেরুর কবি হাভিয়ের সোলোগুরেনের কবিতা, অনুবাদ আমার করা।
কবি: হাভিয়ের সোলোগুরেন
দেশ: পেরু
ভাষা: স্প্যানিশ
কবি-পরিচিতি: লিমার উনিভেরসিদাদ নাশিওনাল মাইওর দে সান মারকোস থেকে তিনি ইস্পানিক সাহিত্যে  ডক্টরেট করেছেন। 'এদিসিয়োনেস দে লা রামা ফ্লোরিদা' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ১৯৫৯ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত। ৫০এর প্রজন্মের আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার বই: 'দেবালো দোরমিদো' (ওকে ঘুমোতে দিন),
'বাহো লোস ওহোস দেল আমোর' (ভালবাসার চোখের নীচে) এবং 'ফোলিওস দেল এনামোরাদো ই লা মুয়েরতে' (প্রেমার্ত ও মৃতের বই)।
                 
কবিতা: গাছ, তুমি যন্ত্রণাদায়ক বজ্রপাত (মূল কবিতা: আর্বোল কে এরেস উন পেনোসো রেলামপাগো)
অনুবাদক: মৈনাক আদক

গাছ, তুমি যন্ত্রণাদায়ক বজ্রপাত,
তোমার কেড়ে নেওয়া বাতাস যেন এক অগ্নিসম বিষয়,
নিশাচর জলের মাঝে আলোর অরণ্য;
আমাকে কি বলতেই হবে,  আমার জন্য একটি ভারী মণি
আমার হৃদয়ে নির্ণীয়মান, একটি গাছের পাতা
যা নক্ষত্রের মতো বিদীর্ণ করে রক্তের আশ্রয় ?

উপেক্ষা করি আরও এক স্থবির গল্প
শান্ত বা গভীর, উপেক্ষা করি আরও একটি দূরবর্তী পদক্ষেপ,
আমার বুকের শ্বাসপ্রশ্বাসের চেয়েও পরিস্কার ছিল সে ঢেউ ।

ওরা জানে, আমি জীবিত, মেঘপুঞ্জ,ওরা জানে, আমি গান গাই
সন্ধ্যার বিভ্রান্তিকর মহিমায়, একা ।
ওরা জানে, আমি জীবিত, স্বর্গ আমায় শক্ত করে বাঁধে,
জেদের বশে লুকিয়ে থাকা আমার কপাল

শূন্য আলোর মতো পড়ে যাবেই মূর্তির পাদদেশে ।

Wednesday, 2 July 2014

অনুবাদ-কাব্যঃ মৈনাক আদক

C/o: সাহিত্য পত্রিকার জুন সংখ্যায় প্রকাশিত আমার অনুবাদ-কাব্য:
কবিআলফ্রেদো পেরেস আলেনকার্ত
দেশ: স্পেন
ভাষা: স্প্যানিশ
কবিপ্রাবন্ধিক  স্পেনের সালামানকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'কাজের অধিকারবিষয়ের অধ্যাপক
আলফ্রেদো পেরেস আলেনকার্ত
জন্ম লাতিন আমেরিকার পেরুর পুয়ের্তোমালদোনাদো শহরে ১৯৬২ সালে ১৯৮৭ থেকেসালামানকায় অধ্যাপনা ২০০৫  নির্বাচিত হন'আকাদেমিয়া কাস্তেইয়ানা 'লেওনেসা দে লাপোয়েসিয়া' সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৯৮ থেকেইবেরো-আমেরিকান কবিদের সভার সংগঠক,বাৎসরিক ফুন্দাসিয়ন দে সালামানকা সিউদাদ দেকুলতুরাউৎসবের পরিচালক অতিসম্প্রতিকারাকাস শহরে আন্তর্জাতিক কবিতা পুরস্কার'মেদাইয়া ভিসেন্তে খেরবাসি'তে ভূষিত হয়েছেন,২০০৯  পেয়েছেন 'হুয়ান দে বানিওকবিতাপুরস্কার তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতার বই: ' বানানের ইচ্ছা' (২০০১), 'মা সেলভা' (২০০২), 'আমাপারো বিদোনের তৃতীয় পুত্রের প্রতি অর্ঘ' (২০০৩), 'আত্মার চামড়ায় ঢাকা পাখি' ( ২০০৬), 'কর্মরত মানুষ' ( ২০০৭), 'আত্মার খ্রীষ্ট' (২০০৯), 'সাভিয়া আন্তিপোদিয়ান' (২০০৯), 'শোনো হেভাইসকল'(২০০৯)  তাঁর কবিতা অনুদিত হয়েছেপোর্তুগিজজার্মানইংরাজীরুশইতালিয়,জাপানিজহিব্রুবুলগেরিয়এস্তোনিয়ভিয়েতনামিজকোরিয়ানরুমানিয়  ইন্দোনেশিয়ভাষায় এই প্রথম অনুদিত হল বাংলায় কবির লেখা নিয়ে একটি দীর্ঘ বই লিখেছেনভেনেসুয়েলার লেখক এনরিকে ভিলোরিয়াবইটির নাম 'পেরেস আলেনকার্তআশ্চর্য কবিতা' ]
অনুবাদক: মৈনাক আদক
কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যায়
                                                                                     তোমার রক্তাক্ত
                                                                                          শব্দাবলী ।
                                                 
                                                                                 তাদের গভীর থেকে
                                                                                  আর বেরিয়ে আসে
                                                                                       সেই শব্দাবলী
                                                                                   যারা আঘাত হানে

                                                                                    অভিগমন করো
                                                                                  আরও আলোকিত
                                                                                        মাটির পানে,

                                                                                          সেই পথে
                                                                              যে পথে তুমি কখনো
                                                                                     হারিয়ে যাওনি।

পূর্বাভাস

দূরবর্তী,
কম্পমান ডালপালার উচ্চতায়
হামিংবার্ডের নিঃশব্দ উড়ানে,
জানায় তার সু-সংবাদ
পূর্বাভাস।

এভাবেই কিছু পাক খায়
ধোঁয়ার মতো যে হাওয়া আর
আছড়ে পড়ে না।

অনন্ত আকাশে
মধু আর ছাইয়ে লেখা
বার্তা পড়ি।

সুদৃঢ় সূর্যোদয়
রাস্তা খুলে দেয় প্রারব্ধ
প্রত্যাবর্তনের জন্য।

আমার শিরায়-শিরায় ওড়ে এখন
হামিংবার্ড।

যখন ওয়াল স্ট্রীট ভেঙে পড়ে

আমার কখনো ছিল না
আজও নেই
অর্থপ্রাপ্তির কাজকর্ম
এতটুকুও

আমার ভোগদখলে শুধু
বাতিলপ্রায়
দুই দরজার একটা গাড়ী,

আর সস্তার একটা ফ্ল্যাট
আমার ছোট্ট শহরের
উপকণ্ঠে

স্বীকার করি, দিশেহারা
লাগেনি আমার
যখন সংবাদের শিরোনামে চোখ রাখি:
"নিউ ইয়র্কের শেয়ারবাজারে
কালো সোমবার"।

আর টর্মসের পাড়ে বসে
প্রাতঃরাশ সারি চুপচাপ,
যখন ভেঙে পড়ে
ওয়াল স্ট্রীট।

বাড়ি ফেরা

একটা কুকুর শুঁকেছিল
আগন্তুক আমার পোশাক
দীর্ঘ ভ্রমণের শেষে।

অতীতে ফিরে তাকানো নয়।

গতকাল এসেছি
গ্রামের প্রবেশদ্বারে
কিন্তু কুকুরটা
ছাড়ে না আমায়।

যদিও
ওকে দেখালাম আবেগপ্রবণতা
 বা এখানকার ঠাকুর্দার
ছবি।

দুহাত ছড়িয়ে
এই মাটিতে
অতর্কিতে আক্রমণ করল আমায়
অভিবাদনের
শাখাপ্রশাখায়।

আন্তরিকতা

একটি মাকড়সার জাল
ধাবমান,
দিগন্ত আড়াল করার
স্বপ্নপূরণ করছে।

কিছু নোংরা হাত
আর বেশিটাই
অনাগ্রহ।

আর তুমি
খুঁজছো বিতৃষ্ণা আর
ব্রণ অপসারণের উপায়
যারা চাপিয়ে দেয় তাদের পছন্দ-অপছন্দ।

সৎ হওয়ার জন্য
এ সেই দুর্বলতা
যা তোমায় শক্তিশালী করে।

পোস্টার

রাস্তায় একটা লোক
পোস্টার দেখায়: "চাকরী নেই
খাবার নেই"।

জবরদখলের সময়, চোখ বন্ধ করে
আর ঠোঁট কামড়ায়
অবিরত।

চেয়ে থাকি চলে যাওয়ার শেষ পর্যন্ত
কেননা,অনেক আগেই
সে ক্লান্ত-বিপর্যস্ত।

তাহলে এবার সাহায্যের হাত বাড়ানো যাক:
এটাই উপস্থাপনযোগ্য।


[ সব কবিতাগুলি কবির 'যেভাবে পথ চলি' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া, প্রথম কবিতাটি মুখবন্ধের শিরোনামহীন কবিতা। ]

অনূদিত অণুগল্প

অনূদিত অণুগল্প
গল্পকার: গ্লাদিস সেপেদা
অনুবাদক: মৈনাক আদক
দেশ: আর্হেন্তিনা,
ভাষা: স্প্যানিশ
কবি-পরিচিতি: নব্বই দশকের আর্হেন্তিনীয় কবি গ্লাদিস সেপেদা মাদ্রাগোরা ছদ্মনামে স্পেনীয় সাহিত্যজগতে পরিচিত, জন্ম ১৯৬৩ সালে রাজধানী বুয়েনোস আইরেসে । আজন্ম সাহিত্যই
জীবনযাপন তাঁর, বিভিন্ন শিল্প ও সাহিত্য কর্মশালার সংগঠক, কবিতাকে অডিওভিশ্যুয়াল মাধ্যমে প্রকাশ করতে নিজের দেশে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন, কবিতা ও গল্প পাঠ করেছেন মেক্সিকো, চিলে, ইউরোপে এবং আমন্ত্রিত কবি হিসেবে বিভিন্ন দেশের বইমেলায় । বিভিন্ন দেশের নতুন কবিদের কবিতা মেলে ধরেন আর্হেতিনীয় রেডিও-টিভিতে, বেশ কিছু সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদিকা এবং "লাকবেরনা"সহ তিনটি অনলাইন পত্রিকার পরিচালিকা । পেয়েছেন আর্হেতিনার সাহিত্য পুরষ্কার আর কলম্বিয়ার সিনে পুরষ্কার । তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই:
আভেইয়ানেদার কবি, ঘুমাও শব্দ, শান্তির কাব্যগ্রন্হ ।

অণুগল্প:
কারণ ( মূল গল্প: কাউসা )

"আমার দুর্ভাগ্যের উৎস কোথায়?" - লোকটা সাপের মতো তাকিয়ে বলে উঠল। সে জানলার ধারে দাঁড়িয়েছিল, মেয়েটার ঘাড়ে এসে পড়া লতানে মাথার এক কণ্ঠস্বর শব্দসৃষ্টিরত। শব্দটা খুব আস্তে শোনা যাচ্ছিল। লোকটার আরও কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালো, মাত্র কয়েক সেণ্টিমিটার দূরে দাঁড়িয়ে মেয়েটা বলল: "ঝকঝকে চোখ আর অর্থহীন আঁতেল মুখ নিয়ে  অপাপবিদ্ধ নির্মল হতে চাওয়া, আপনি তো সরাসরি উত্তর দিতেও জানেন না, শব্দের খেলায় হারিয়ে যায় আসল কথাটা। যা বলতে চান, তা বলেন না। বোঝার জন্য আপনি হাজারবার শুনুন, তারপর ভয়ডরহীন উত্তর দিন।"
আর ঝামেলা না বাড়িয়ে  লোকটা লতানেকে ধন্যবাদ দিল, অলস ভাবনায় ডুবে যেতে যেতে জানালা বন্ধ করে দূরে সরে গেল: ছোট্ট গাছটা যেন প্রাজ্ঞ, প্রশ্নের মতোই ধারালো উত্তর দেয়।
শোবার ঘরের দিকে যেতে যেতে লোকটা দৃঢ় সংকল্প নিল আর কখনো ওকে এরকম প্রশ্ন করতে আসবে না, তার চেয়ে মেনে নেবে ধাঁধাঁর জটিলতাহীন মুক্ত মানুষ হিসেবে তার কপাললিখন, অবাধ স্বাধীনতার যাপন...

হট্টগোল ও জানালার কাঁচ ( মূল গল্প: সোনেস ই ভিদ্রিয়োস )

হৈ-হল্লার ওপর নজরদারী চালাই, ওরাও আমার পিছু পিছু আসে, কোথাও আটকাতে পারি না ওদের, কারণ আমি জানি, ওরা আমাকে থামাতে চায় যাতে আমি ওদের দিকে মনোযোগ দিই। কিন্তু আমি তো তা চাই না, ওরা তো আমার কেউ না, পাশের বাড়ীর জানলায় থাকা অযাচিত হৈচৈ শুধু, সবসময় আমায় খুঁজে বেড়ায়, দুচক্ষে দেখতে পারি না ওদের, অব্যাহতিও পাই না। জঘন্য! ... যাচ্ছেতাই! অপমান আর ফাজলামি ছাড়াও ওরা সারাক্ষণ ফিসফিসিয়ে কথা চালিয়ে যায়। সকাল থেকে ওদের কাজ হল অন্যদের হল্লার সঙ্গে নিজেদের হৈচৈ মেশানো বা নাক ডাকা। রাত থেকে ওরা চরতে বেরোয় হল্লা করার জন্য, ইঞ্জিনের শব্দ, পাখার শব্দ, পাথরের শব্দ, খাড়াই বাঁধ থেকে পড়ে যাওয়ার শব্দ, বকবকানি আর উচ্চগ্রামের সঙ্গীত, ফাঁকা প্লেট থেকে পড়ন্ত মৃত ফুলের শব্দ, সোনালি খাঁচায় বন্দি শিংওয়ালা কাল্পনিক পশুদের শব্দ, কাগজ স্পর্শ করার আগে বোলতার গুণগুণ, কাঠ আর প্লাইউডের মেঝেয় বুটের শব্দ, বাচ্চাদের কান্নার আর রঙিন গ্লোবের নতুন আলোর শব্দ, আকাশে ভাসমান ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণুর শব্দ, বহুদূরের লাইব্রেরীর প্রাচীন বই পড়ে যাওয়ার শব্দ, এইসব আওয়াজে আমার কান ঝালাপালা হয়ে যায়, ওরা বারবার আমার দুঃস্বপ্নে ফিরে আসে। যদি সবকটাকে সাবাড় করতে পারতাম! ওরা জানলায় না থাকলে হয়তো বিস্মৃতি আর যন্ত্রণায় মরেই যেতাম, হয়তো বেঁচে থাকতাম আমার অন্তরাত্মার নিজস্ব শব্দমালার নৈঃশব্দে...

প্লোরুনিও ( মূল গল্প: প্লোরুনিও )

ওই তো ওখানে প্লোরুনিও। মনে হয় এবার ওর সময় এসেছে, ওকে খুঁজে বেড়াই আমার মননে আর সামনে। কোন্ প্রাচীন আকাশে নাক্ষত্রীয় বরফের প্রতিটা ফোঁটার হিমায়নে ব্যস্ত ছিল?
আমার তো ওকে ধরে এনে আদর করতে ইচ্ছে হয়: প্লো-রু-নিও, ও যেন আত্মহারা, ও যেন বৃদ্ধের অন্ধ চোখের মতো ভারী যার বসবাস পার্কের বেঞ্চে। কি ভয়াবহ! বেচারার সুখ-শান্তি নেই, পুরোনো যন্ত্রণায় ছটফট করে শুধু।
অসম্ভব স্বপ্নে কে যেন ফিরিয়ে দিয়ে যাওয়ার অসহনীয় শর্তে হতভাগ্য ফেলে যাওয়া বাচ্চাটাকে নিয়ে যায় । তাই ও এরকম...
আমার পাঁচতলার শান্তশিষ্ট প্রতিবেশী হুয়ান ওর ওপর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে, জগতের সব খারাপ কাজে প্লোরুনিওর হাত থাকুক বা না থাকুক।
দারুণ অলৌকিক কিছু ঘটবার আশায় বাকী সবাই যখন ভাগ্যের অন্বেষণে অন্য মহাদেশে পাড়ি দেয়, ভাবি, প্লোরুনিও যদি সবার কাছে একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকত, আসলে লোকে ওকে বুঝতেই পারে না।
কেউ জানে না প্লোরুনিওর বসবাস নিজেরই অন্দরে

সবসময় একই মুহূর্তে ( মূল গল্প: সিয়েমপ্রে আ এস্তা ওরা )

সবসময় একই মুহূর্তে নিজেকে ছেড়ে দিই অন্তহীন সময়ের টানাহ্যাঁচড়ার মাঝে, অফিসের চার দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত কফির চুমুকে, কম্পিউটার, ফাইল আর কাগজের তাড়ায় ন্যুব্জ অনিদ্রার রোগী কলিগদের সামনে, সুন্দরী মেয়েটা দস্তানায় মোড়া হাত দুটো ছড়িয়ে দেয় আমার দিকে, ওকে ছুঁতে পারতাম, হারিয়েও যেতে পারতাম অচেনা কোটি কোটি লোকের মাঝে, কিন্তু নিজেকে সংযত করি, কিন্তু আমি তো পরাজয়ের জারকরসে অব্যর্থ পদ্ধতিতে সৃষ্ট
এক দৈবনির্দিষ্ট পুরুষ, লজ্জায় মাথাটা নিচু হয়ে যায়, অনস্তিত্ব  আর হারাকিরি খেলার গভীরতায় ডুবে যাওয়া... খেলাটা জ্বালাতন করেই চলেছে যতক্ষণ না নশ্বর মহাসাগরে নিমজ্জিত কালের অন্ধকারে হাড়মাসে ভিজে চুপচুপে যায় মন, জীবন আর অপেক্ষা করবে বলে মনে হয় না, ক্ষুরের খোঁচা লাগে পিঠে, ঘাড়ের দিকে মসৃণ গতিতে এগোয়, যেন মুক্ত রক্তবাহ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে,
কিন্তু সবটাই আসলে আমাকে ঘুম থেকে টেনে তোলার রোজকার ফাঁদ, যখন ঘড়িটা জানিয়ে অফিসে বেরোবার সময় হয়েছে, যদিও আজ অন্য কোথাও যাবো।


[অণুগল্পগুলি মূল স্পেনীয় ভাষা থেকে অনূদিত]

২৭ এর প্রজন্ম: ফ্ল্যাশব্যাক

'অচেনা যাত্রী'র জুন সংখ্যায় প্রকাশিত আমার লেখা প্রবন্ধ:

২৭ এর প্রজন্ম: ফ্ল্যাশব্যাক

মৈনাক আদক

কয়েকদিন আগে স্পেনের মুরসিয়াবাসী কবিবন্ধু পাবলো মার্তিনেসের সাথে অনলাইনে আড্ডা দিতে দিতে প্রসঙ্গক্রমে উঠে এল সাহিত্যের স্বর্ণযুগ এবং  বিশেষ কবিদলের কথকতা ও প্রভাব।  স্পেনীয় সাহিত্যের ইতিহাসে মুরসিয়া, মালাগা, মোগেরসহ বৃহৎ  আন্দালুসিয়ার গুরুত্বের তুলনা হতে পারে স্বাধীনতার লড়াইয়ের সময় বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টির প্রাচুর্যের সাথে ও কবিদের কবিতায়-গানে-নাটকে সাম্রাজ্যবাদের কদর্যতার ভারে নুইয়ে পড়া সাধারণ নাগরিকমানসে নতুন করে বেঁচে থাকার ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের সাথে। ২৭ এর প্রজন্ম স্পেনীয় সাহিত্যের ইতিহাসে দ্বিতীয় স্বর্ণযুগের রূপকার। আসলে ১৯২৩ থেকেই বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্পেনের কবি ও চিত্রকরেরা 'আভাঁ-গার্দ' ফর্ম নিয়ে একসাথে কাজ করার জন্য সলতে পাকানো শুরু করলেন। স্বর্ণযুগের বারোক কবি লুইস-দে-গোঙ্গোরার মৃত্যুর ৩০০ বছর উপলক্ষে ২৭ এর প্রজন্মের কবিরা ১৯২৭এ প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করলেন সেভিয়ায়।
প্রবীণ ও নবীন সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ১৬ই ডিসেম্বর গোঙ্গোরার প্রতি শ্রদ্ধার্পণ করলেন আতেনেয়ো দে সেভিয়া লাইব্রেরীতে, যে লাইব্রেরী আজ মহৎ দ্রষ্টব্য এক মিউজিয়াম। এই  শ্রদ্ধার্পণ উৎসবই সূচনা করল ২৭ এর প্রজন্মের।
এই দল আরও বেশ কিছু নামে পরিচিত ছিল: "প্রজাতান্ত্রিক প্রজন্ম", "একনায়কতন্ত্রের প্রজন্ম", "২৫এর প্রজন্ম"( কাকতালীয়ভাবে ২৭ এর প্রজন্মের বেশিরভাগ কবির প্রথম কাব্যগ্রন্হ বেরোয় ১৯২৫এ), ''আভাঁ-গার্দ প্রজন্ম", "বন্ধুত্বের প্রজন্ম" এবং "গিয়েন-লোরকা প্রজন্ম"( কারণ, এই দলের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য ছিলেন খোর্খে গিয়েন এবং সবচেয়ে নবীন সদস্য ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা)। দলের বাকি আটজন সদস্য ছিলেন কবি
পেদ্রো সালিনাস, রাফায়েল আলবের্তি, দামাসো আলোনসো, খেরার্দো দিয়েগো, লুইস সেরনুদা, ভিসেন্তে আলেইসান্দ্রে, মানুয়েল আল্তোলাগিররে এবং এমিলিও প্রাদোস। এছাড়াও মিগেল এরনানদেস, লেওন ফেলিপের মতো  প্রথিতযশা কবিরাও ২৭ এর দলের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। নোবেলজয়ী কবি হুয়ান রামোন হিমেনেথ প্রথমদিকে নিয়মিত সংবাদপত্রে ২৭ এর দলের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করলেও ১৯৩০এর দিকে বিরোধ ভুলে দলে যোগদান করেন। ২৭ এর দলে কবিরা জোট বাঁধা শুরু করলেও কিছুদিন পরে যোগ দিলেন লুই বুনুয়েল, সুররেয়ালিস্ত চিত্রশিল্পী সালভাদোর দালি, ওস্কার দোমিঙ্গেস, ভাস্কর মারুখা মাইয়ো প্রমুখ। স্পেনে ২৭ এর দলের জন্ম হলেও তাঁদের সব লেখা এস্পানিওল ভাষায় প্রকাশিত হয়নি, দালি ও দোমিঙ্গেস ২৭ এর দলের হয়ে ফরাসী ভাষায় অমূল্য কিছু প্রবন্ধ লিখলেন। দূর থেকে হলেও চিলে থেকে পাবলো নেরুদা, ভিসেন্তে উইদোব্রো এবং আর্হেন্তিনা থেকে হোর্হে লুইস বোর্হেস ২৭ এর চিরনবীনদের অভিবাদন জানালেন, এসে পড়লেন সমকালীন স্পেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি আন্তোনিও মাচাদো।  মাদ্রিদ শিল্প সংস্কৃতির রাজধানী হলেও ২৭ এর দলের রাজধানী হয়ে উঠল তাঁদের আঁতুরঘর দক্ষিণের প্রাণোচ্ছল নগরী সেভিয়াই, কারণ বেশিরভাগ কবির বাস সেভিয়া তার কাছাকাছি মালাগা, মুরসিয়া, আর তেনেরিফেতে।
তাই ২৭ এর দলের মুখপত্রগুলিও প্রকাশিত হত এইসব শহর থেকেই: সেভিয়া থেকে বেরোতো 'মেদিওদিয়া', তেনেরিফে থেকে 'গেসেতা দে আর্তে', মালাগা থেকে 'লিতোরাল'।
২৭ এর কবিদের লেখনির বৈচিত্রের জন্য তাঁদের লেখার নির্দিষ্ট কোনো ধাঁচ দেখা যায় না, প্রত্যেকেই তাঁদের স্বকীয়তা নিয়ে ১৯২৫এর মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত কবি হয়ে উঠেছিলেন, যেমন লোরকা ও আলবের্তি ছিলেন নিও-ফোকলোরের পদানুসারী, তাঁদের লেখায় আন্দালুসিয় লোককথার স্পষ্ট প্রভাব, লোরকা তো পাঠকের কাছে 'চারণকবি' হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
খোর্খে গিয়েন ও পেদ্রো সালিনাস ছিলেন স্পেনীয় ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক এবং তাঁরা একসাথে লিখতে পছন্দ করতেন। তাঁদের কবিতায় নৈরাশ্যবাদ সরিয়ে আশাবাদের দর্শন সর্বত্র দেখা যায়। আলবের্তি প্রথম জীবনে প্রেমের কবিতাকে অমরত্ব দিয়েছিলেন, ১৯৩৬এ স্পেনীয় গৃহযুদ্ধে সাধারণ মানুষের হয়ে হাতে বন্দুক তুলে নিলেন আর তারপর রাজনৈতিক কবিতাকেও পৌছে দিলেন আন্দালুসিয় ক্ষেতখামার থেকে পিরেনের চূড়ায়। আবার সুররেয়ালিস্ত কবি ভিসেন্তে আলেইসান্দ্রে ও সেরনুদার লেখায় সুররেয়ালিজমের স্পষ্ট প্রভাব। এদের সবার শিক্ষক ছিলেন কবি হুয়ান রামোন হিমেনেথ যাঁর লেখায় আন্দালুসিয় নিসর্গজগৎ আর তুচ্ছাতিতুচ্ছ মানুষের মনের অন্তঃপুরের ছবি। আশ্চর্য মিল তাঁর সাথে রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যদৃষ্টিতে, নিসর্গের প্রতি আকর্ষণে, জীবনের রহস্যের প্রতি আসক্তিতে। কিন্তু তাঁদের সবার লেখার মধ্যেই বৈশিষ্ট্যগত কিছু সাযুজ্য ছিল: মেধা ও ভাবালুতার নিখুঁত ভারসাম্য, রোমান্টিক ও ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের পাশাপাশি উপস্থিতি, নান্দনিকতা ও মানব সত্যতার ভারসাম্য, বিশ্বসাহিত্য ও স্পেনীয় সাহিত্যের দ্বন্দ্ব, ঐতিহ্য ও সংস্কারের ভারসাম্য এবং লোকসঙ্গীতের মূর্ছনা।
১৯৩৬এ স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হতেই ২৭ এর নবীন কবিরাও বন্দুক নিয়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করলেন একনায়ক জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে। তাঁদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, আমরিকা ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের কবিরা অনেকেই এই যুদ্ধে যোগ দিলেন। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধে পোক্ত ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে কবিরা পেরে উঠলেন না। ভেঙে পড়ল স্পেনীয় সাহিত্যের ইতিহাসের কবিতার স্বর্ণযুগের যৌথখামার।
১৯৩৬এ ১৯শে আগস্ট কাকভোরে ফ্রাঙ্কোর সাঙ্গোপাঙ্গোরা লোরকাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে চার বন্ধুর সাথে গুলি করে হত্যা করে গ্রানাদায় গোপনে কবর দিয়ে দেয়, সেই রহস্যের আজও কোনো কিনারা হয়নি। মিগেল এরনানদেসের মৃত্যু হল যক্ষায়, জেলের মধ্যে। আলবের্তি, সালিনাস, সেরনুদা, খোসে বেরগামিন, লেওন ফেলিপে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে গেলেন এবং পরস্পরের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চললেন। আন্তোনিও মাচাদোও মারা গেলেন জেলেই, স্লো-পয়জনে মারা হয়েছে তাঁকে এরকম কথাও শোনা গেছে। হুয়ান রামোন হিমেনেথ পুয়ের্তো রিকোয় শিক্ষকতায় চাকরী নিয়ে চলে গেলেন, ১৯৫৫ পর্যন্ত থাকলেন এবং ঐসময়ে স্ত্রী সেনোবিয়া কামপ্রুবির সহায়তায়  রবীন্দ্রনাথের ছোটদের জন্য লেখা গল্প ও কবিতার একটি দীর্ঘ সংকলন অনুবাদ করলেন। দামাসো আলোনসো ও খেরার্দো দিয়েগো জেনারেল ফ্রাঙ্কোর কাছে প্রায় বশ্যতা স্বীকার করে স্পেনেই থেকে গেলেন এবং ৫০ এর প্রজন্মের কবিতা আন্দোলনে নতুন কবিদের পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। আলেইসান্দ্রে নিজের দেশেই স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়ে গেলেন এবং ৫০ এর প্রজন্মের কবিদের সাথে লিখে চললেন। ১৯৭৭এ নোবেল পুরস্কার নিয়ে মঞ্চে তিনি বলেছিলেন: "আমার এই নোবেলপ্রাপ্তির কৃতিত্ব আমার একার নয়। এ পুরস্কারও আমার একার নয়। এ পুরস্কার ২৭ এর প্রজন্মের সকল কবির পুরস্কার। আমি তাঁদের হয়েই নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করলাম।"
২৭ এর কবিদের কিছু কবিতা:
সৈকত: পেদ্রো সালিনাস

যদি না যেতো অন্বেষণে
দুর্বল, ছোট্ট, দুধসাদা গোলাপের
অনেক দূরের আহ্বান তার
কে যেন বলেছিল আমায়
তখনও তার শ্বাস পড়ছিল
তখনও সে জীবিত
ভেতরে তখনও তার উদ্দীপনা
সে চেয়েছিল সমগ্র পৃথিবী
সুনীল, প্রশান্ত, জুলাইয়ের সাগর?

তার সাথে: রাফায়েল আলবের্তি

ডিঙি ভাসাবো, বন্দর থেকে কাকভোরে
পালোস দে মোগেরের পানে
দাঁড়হীন খেয়াতরীর ওপর
একা, রাতভোর, সাগরে!
বাতাস আর তোমার সান্নিধ্য
তোমার কৃষ্ণঘন শ্মশ্রু
আমি তো অজাতশ্মশ্রু

কৈশোর: ভিসেন্তে আলেইসান্দ্রে

আসতে-যেতে তুমি
এ পথে সে পথে
কখনো দেখতাম
কখনো পথ ধূধূ
সাঁকো থেকে সাঁকোয় হেঁটে যেতে
দৃঢ় পদক্ষেপে
পড়ন্ত আলোয় হাসিখুশি

হে কিশোর, দেখতাম
জলের উচ্ছল স্রোত
আয়নায় তোমার চলে যাওয়া
বাধাহীন বহতা, দূরে বিবর্ণ মিলিয়ে যাওয়া।

গরম কফি: ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা

ক্রিস্টালের আলো
আর সবুজ আয়না।

অন্ধকার মাচায়
পাররালা কথা
চালিয়ে যায়
মৃত্যুর সঙ্গে।
মৃত্যুকে ডাকে
সে আসে না।
আবার ডাকে
লোকে কাঁদতে চায়
আর সবুজ আয়নায়,
সারিবদ্ধ প্রজাপতি
উড়ে যায়।
* কবিতাগুলি মূল এস্পানিওল থেকে অনুবাদ করেছেন প্রবন্ধকার।

তথ্যসূত্র:
১) এল ভেইনতিসিয়েতে কোমো খেনেরাসিওন ( ১৯৭৮): খুয়ান মানুয়েল রোসাস
২) খেনেরাসিওন দে ভেইনতিসিঙ্কো ( ১৯৫৭): লুইস সেরনুদা
৩) পানোরামা ক্রিতিকো দে লা খেনেরাসিওন দে ভেইনতিসিয়েতে ( ১৯৮৭): দিয়েস দে রেভেঙ্গা
৪) লা পোয়েসিয়া দে লা খেনেরাসিওন দে ভেইনতিসিয়েতে ( ১৯৭০): খোসে লুইস কানো
৫) এল লেঙ্গুয়াখে পোয়েতিকো  দে লা খেনেরাসিওন গিয়ন-লোরকা ( ১৯৫৪): খোয়াকিন গোনসালেস মুয়েলা