Sunday, 3 August 2014

অণুগল্প

অনেকদিন আগে আমার এই অণুগল্পটি তথ্যকেন্দ্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল:

আশ্রিতা
আমার ট্রান্সফার অর্ডার এসে গেছে। ফিরে যেতে হবে মধ্যপ্রদেশের সেই জঙ্গলমহলে, যেখানে শৈশব থেকে চাকরিতে যোগ দেওয়া... সবই ক্রমানুসারে ঘটে গেছে। পুরোনো দেশে ফিরতে পারব আবার। স্বস্তি আর আনন্দ মিলেমিশে অস্থির করে তুলছে আমায়। হঠাৎই চোখ দুটো বারান্দার দিকে চলে গেল। আমার আশ্রিতা বৃদ্ধা বসে আছেন স্থির। শেয়ালদা স্টেশনে ওঁর ছেলেরা ওনাকে ফেলে পালিয়েছিল গঙ্গাসাগরের মেলার সময়। একাই থাকি এই ফ্ল্যাটে। কিছু না ভেবেই আশ্রয় দিয়েছিলাম সেদিন। একদিনেই অগোছালো এই ফ্ল্যাটের আবহ বদলে গেল আমূল। কে যে কার আশ্রিত বুঝিনি ঠিকমতো। আমি চলে গেলে ওনার কি হবে, ভাবিনি। টুকরো টাকরা জিনিসপত্র নিজের ছোট্ট ব্যাগটায় গুছিয়ে নিচ্ছেন অচেনা দেশের আমার 'জেঠিমা', যেভাবে যাযাবররা যাওয়ার আগে নিজেদের তাঁবু তুলে নেয়। পড়ে থাকে বাঁশ পোঁতার গর্ত আর খাঁ খাঁ শূন্যতা। বারান্দার দিকে তাকিয়ে মনটা হু হু করে উঠল। আস্তে আস্তে জেঠিমার পাশে মেঝেতে বসে পড়লাম।
' কী করছেন জেঠিমা?'
'বাড়ি যাবো বাবা। তুমি তো ফিরে যাবে বাবা মায়ের কাছে...'
'কাজের ট্রান্সফার যে জেঠিমা! না হলে...কিন্তু আপনি কিভাবে বাড়ি ফিরবেন ? তার চেয়ে আমরা
একসঙ্গেই মধ্যপ্রদেশে যাই না ? আমার বাবা-মাও আপনার সঙ্গ পেলে মন খুলে গল্প করবেন।
আপনারও ভাল লাগবে, দিন কেটে যাবে সুখে-সান্নিধ্যে !'
' না বাবা, তা হয় না। এই সবুজ মাঠ, নরম মাটির গন্ধ ছেড়ে ভিনদেশে মরতে পারব না। ছেলেদের হাতের আগুনই চাই যে আমার !'
' কিন্তু----'

' না বাবা, মনে কোরো দুদিন দেখা হয়েছিল আমাদের, তারপর---' চোখের জল মুছে বৃদ্ধা বলে উঠলেন--- ' তোকে ভালোমন্দ কিছুই খাওয়াতে পারিনি রে পুলু। আজ একটু ইলিশ এনে দিস তো ! এমন রাঁধব, স্বাদ ভুলতে পারবি না।'

No comments:

Post a Comment