Friday, 28 February 2014

আমার কবিতা

আত্মপ্রকাশ
পাথর গুঁড়িয়ে যাবার মুহূর্তে
মাথার ওপর আকাশটা ঘুরছিল মণ্হর চক্রগতিতে
বরফকুচির মতো তারারা নেমে আসছিল দিগন্তরেখায়
চোখের সামনে একের পর এক নক্ষত্রপতন
যেন উন্মোচিত হচ্ছে সে নিজেই
গভীর হিম উষ্ণতায় ভুলে গেল সে পাগলামি অথবা বদ্ধজীবন
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সুদীর্ঘ যণ্ত্রণা-----
দুঃসহ এক মগ্নতায় রাত সঙ্গোপনে ঢেউয়ে ঢেউয়ে
ভাসিয়ে দিল তাকে
সম্পূর্ণ আকাশ ছড়িয়ে গেল তার মাথার ওপর
পর মুহূর্তে
ভেঙে পড়ল পিঠ জুড়ে
ভয়ের হাত থেকে আজন্ম উদভ্রান্ত দিক-ভুল পালিয়ে
বেড়ানোর শেষে
যেন সে খুঁজে পেয়েছে তার শিকড়
একটা শিশু আর মৃত্যু যেভাবে নিঃশব্দ বিচরণ করে
সেইরকম বাধাবন্ধনহীন মণ্হর শব্দের ভেতরে

পরিত্যক্ত ছিল তার চলিষ্ণু আত্মপ্রকাশ

আমার অণুগল্প

জগৎ
ঘুরে ঘুরে বাজার করছে অনিমেষ, অনেকদিন পর. রাতের পর রাত হুইস্কিতে ডুবে থাকা সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অনিমেষ মিত্র মামার জন্য কিনছে সুগন্ধী বাসমতী. বাবা বড় ভালবাসত কালবোশ. মায়ের জন্য বাটা. দাদার পাঁঠার মাংস. দিয়া? অনিমেষের প্রথম পাপ, প্রেম. বকুলগন্ধ শরীরে মেখে আমসত্ত্ব খেতে বড় ভালবাসত ও. ফুলপিসির জন্য গাওয়া ঘি. দাদুর জন্য চাঁপা কলার মোচা, গন্ধরাজ লেবু. মোচা-চিংড়ি, মাছের ডিমের বড়া গন্ধরাজ লেবুর গন্ধমাখা ভাতের সঙ্গে বড় প্রিয় ছিল ওর-ও.
একবোঝা বাজার নিয়ে টানারিকশায় বসে যেতে যেতে ওর মনে পড়ে যাচ্ছে কৈশোরে গ্রামের সেই দিনগুলোর কথা--- ট্রেনের ছুটে যাওয়া, দাদুর মোহনবাগান মাঠে যাওয়া, দিয়ার সঙ্গে বর-বউ খেলতে খেলতে

ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে সম্বিত ফিরল অনিমেষের. ফিরতে দেরি হয়ে গেছে অনেক. ডোরবেল বাজাল অনেকবার. অথচ খুলছে না কেউ. পুরোনো দিনের অভ্যেসমতো বোধহয় সন্ধ্যা হতেই ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই. নাহ্, সাড়া নেই কারোর. অগত্যা পকেট থেকে ডুপ্লিকেট চাবি বের করে দরজা খুলল অনিমেষ. ঘর অন্ধকার. দেওয়াল হাতড়ে আলো জ্বালল, পাশের ঘরে গেল. তার পাশেরটায়. ব্যালকনিতে. নাহ্, কেউ কোথাও নেই. ক্ষণিকের জন্য ফিরে এসে অনিমেষের মৃত আত্মীয়রা আবার ফিরে গেছে. আপাদমস্তক পেশাদারীত্বে মোড়া প্রৌঢ় অনিমেষের জন্য ফিরিয়ে দিয়ে গেছে মাটি, রোদ্দুর, বৃষ্টি, স্বাদ-বর্ণ আর বকুলের গন্ধমাখা এক হারানো অপার্থিব জগৎ.

আমার কিছু কবিতা:

বৃক্ষবীজ

ছড়িয়ে দাও না-পাওয়া আর্তির বৃক্ষবীজ
যে সব উদ্ভিদেরা জন্মাবে, ওদের ডানা থাকবে
থাকবে ওড়ার সাধ, শুধু সাধ্য হবে না কোনোদিন
ডিঙিহীন নৌকায় স্বেচ্ছাবিদায় রেখে
চলে যেও তোমার অনিকেত গন্তব্যপথে
উদ্ভিদের গায়ে আম্তজস্নেহে সিঞ্চন করে
স্মৃতিকথা জাগিয়ে রাখবো
তোমার আসা-যাওয়ার পথে ।
কেউ জানবে কখনো মাটি ছুঁয়ে যাওয়া মেঘরাজি
রেখেছিলে ভুলবশতঃ আমার ঘরে

নিজেরই অজান্তে ।

দূরত্ব
আমার জীবনবিজ্ঞান শিক্ষক একবার বলেছিলেন
গাছের সাথে একঘরে না ঘুমোতে
সেই থেকে গাছের সাথে ঘুমোইনি কোনোদিন
একাই ঘুমোই আজও, বটবৃক্ষের সাহায্য ছাড়াই
অনেক গাছ ছিল একসময়মহীরূহ থেকে লজ্জাবতী পর্যন্ত---
সে এক সবুজ ছলকে ওঠা অভিজ্ঞান
ভালবাসতাম ওদের
পরস্পর বিহ্বল ঘূণিপাকে ওরা নিভে গেছে
আমার জীবন থেকে
যেভাবে হাতের মুঠোয় ধরা পৃথিবীও
বাড়ায় সম্পর্কের দূরত্ব.

আমার কিছু কথা

গৌরচন্দ্রিকা :


কবিতা লেখার কথা ছিল না আমার । ভাবিইনি কখনো তেমনভাবে । তবে ছোট থেকে জলরঙে ছবি আঁকতাম । তাতে মনের কোণে জমে থাকা দুঃখটুঃখ থাকলে উড়ে যেতো । সাথে ছিল আমার অন্তর্মুখীনতা আর বই পড়ার তীব্র নেশা । এসব দেখে বাবা আমার ঘরটাকে লাইব্রেরী বানিয়ে দিলেন । কলেজে যাওয়ার সময় থেকে শুরু হলো বইয়ের সাথে আর বইয়ের মাঝে বাস । এর মধ্যে চোখে কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ায় আঁকিয়ে হওয়ার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে বইয়ের রাজ্যে ডুব দিলাম, আঁকা বন্ধ করলাম না, এখনো সুযোগ পেলেই পেনসিল আর তুলি নিয়ে বসে পড়ি । ঘোরার সুবাদে কিছু ভ্রমণকাহিনী লিখে মকশো করা শুরু করেছিলাম । কিন্তু বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একদিন বন্ধু অভীক যখন লিটলম্যাগ করার প্রস্তাব দিল, চমকে উঠলাম, দুরু দুরু বক্ষে কিছু অণুগল্প নিয়ে লেখা শুরু করলাম । পাঠকের প্রতিক্রিয়া দেখে উৎসাহ জাগল । তারপর প্রায় দশ বছর হয়ে গেল । কবিতা পাক্ষিক, কবিতা সীমান্ত, তথ্যকেন্দ্রর মতো পত্রিকায় লেখা বেরোতে থাকল । ফরাসী আর স্প্যানিশ ভাষার চর্চা শুরু করলাম । ভাষা আজ আমার পেশা, তার সাথে এই দুই ভাষায় বিভিন্ন দেশে লেখালেখি, বাংলায় অনুবাদ । তাই সবসময় আর বাংলা পত্রপত্রিকায় লিখে উঠতে পারি না, লেখা চলতে থাকে মনে... মাতৃভাষা মায়ের মতোই ছেয়ে আছে আমার মননে, হৃদয়ে, সর্বাঙ্গে...