Monday, 19 May 2014

রবীন্দ্র-শ্রদ্ধার্ঘ্য

অচেনা যাত্রীর মে মাসের সংখ্যায় আমার রবীন্দ্র-শ্রদ্ধার্ঘ্য:

ইস্পানিয় স্পেনীয় জগতে রবীন্দ্রনাথ:

মৈনাক আদক

কয়েকদিন আগে সুদূর পেরু থেকে পাঠানো বন্ধুর উপহারের বাক্স খুলতে গিয়েই আমার চোখ আটকে গেল রঙিন কাগজে মোড়া বইটায় । অনেক দৃষ্টিনন্দন মিনিয়েচার, চকলেট আর জামাকাপড়ে ঠাসা বাক্স থেকে আগে বইটা তুলে নিলাম, মোড়ক খুলতেই বিস্ময়---- " লা কাসা ই এল মুন্দো", রবীন্দ্রনাথের "ঘরে বাইরে" উপন্যাসের স্পেনীয় অনুবাদ । ২০০৩ সালে প্রকাশিত ।  আজকের ইস্পানিয় স্পেনীয় জগতে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা কতটা, এই বইটা সেই উদাহরণের তালিকায় গৌরচন্দ্রিকামাত্র । কাজের সূত্রে রোজই ইস্পানিয় স্পেনীয় মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়, তাই স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সমাজের বিভিন্ন স্তরের এবং বয়সের মানুষের সাথে কথা বললে দেখি, স্প্যানিশে অনূদিত রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতাই আজও আর্হেন্তিনা, উরুগুয়াই, পারাগুয়াই, চিলে, পেরু, মেহিকো, স্পেন এমনকি এল সালভাদোর, নিকারাগুয়ার মতো দেশে স্কুল থেকেই পড়ানো হয়, কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের ক্লাসে রবীন্দ্রনাথ অবশ্যপাঠ্য--- কয়েক মাস আগেই উরুগুয়াই এর গার্নিয়ে কোম্পানীর কর্ণধার নেলসন আলপুই এর দোভাষী হিসেবে সঙ্গদানের সুযোগ এসেছিল, প্রথম দিনেই তাঁর সমস্ত ব্যবসায়িক কাজকর্ম সেরে ফেলেন পরেরদিন শুধুমাত্র তাঁর মনের তীর্থস্থান জোড়াসাঁকোয় যাবেন বলে । আমাকে অবাক করে দিয়ে  স্প্যানিশে অনূদিত রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির কবিতা স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করে যান, জোড়াসাঁকোর বাগানে অপার শান্তি নেমে আসে, যেভাবে রবীন্দ্রনাথে শান্তি পান  উরুগুয়াই এর পাঠক । লেখালেখির সূত্রে কিছুদিন আগে যোগাযোগ ঘটে সমকালীন স্পেনীয় কবি আলফ্রেদো পেরেস আলেনকার্ত, তিনি সালামানকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাও করেন, তাঁর গবেষণার বিষয় রবীন্দ্রনাথের লেখায় সমাজভাবনা, শিক্ষাভাবনা রাজনৈতিক ভাবনা । যেহেতু রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ, গল্প এবং উপন্যাস স্প্যানিশে  খুব কমই অনূদিত হয়েছে আজ পর্যন্ত, তাই মালমসলার সন্ধানে প্রায় চষে বেড়ান সর্বত্র আর আমার কাছে হাট করে খুলে দেন স্পেনে সাম্প্রতিক রবীন্দ্রচর্চার আশ্চর্য এক ছবি--- মাদ্রিদ শহরের প্রান্তেই আছে বিবলিওতেকা দে তাগোরে--রবীন্দ্রপাঠাগারে যেখানে রবীন্দ্রনাথের লেখার স্প্যানিশ অনুবাদ আর তাঁর সম্মন্ধে লেখা বইয়ের সংগ্রহ একুশ হাজার । রবীন্দ্র অনুরাগী এক শিক্ষকের একক প্রচেষ্টায় শুরু এই পাঠাগার আজ মাদ্রিদে রবীন্দ্রচর্চার প্রাণকেন্দ্র, বাচ্চা থেকে বয়স্ক, সব পাঠকের রোজকার সমাবেশ হয় সেখানে । বার্সলোনায় অনেকদিন ধরে চলছে ক্লুবো দে তাগোরে-- টেগোর ক্লাব যারা শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের নাটক স্প্যানিশে মঞ্চস্থ করে, সপ্তাহান্তের শোগুলিতে কোনোদিন মঞ্চস্থ হয় ডাকঘর, কোনোদিন বা শোধবোধ, রাজা বা চিরকুমার সভা । সেখানে স্কুলের বাচ্চারাই ডাকঘর বা শোধবোধ নাটকে প্রধান কুশীলবের ভূমিকায় যুক্ত । আন্দালুসিয় স্পেনের বিভিন্ন শহরেও হয়ে চলেছে রবীন্দ্রচর্চা, কবি আলফ্রেদো সেভিয়ায় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষার স্কুলে গেছেন, ঘুরে এসেছেন মালাগার রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রেও । মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় সব দেশেরই রাজধানী শহরে রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র রয়েছে । তবে রবীন্দ্রচর্চার উন্মাদনা সবচেয়ে বেশি আজও চোখে পড়ে আর্হেন্তিনা আর চিলেতে । এই দুই দেশেই ঘটা করে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালিত হয় প্রতিবছর আর সমকালীন কবিরা রেডিও স্টেশানগুলিতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাদের নিজ নিজ অনুভবের ডালি উজাড় করে দেন । সৌভাগ্যক্রমে গতবছর  রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালনের কয়েকদিন আগে এই অধমকে  রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কিছু বলার জন্য এক আর্হেন্তিনীয় রেডিও চ্যানেল আমন্ত্রণ করে বসে,  এরকম বিপদে আগে পড়িনি, যাইহোক করে একটা লিখে দিই, কবি লুইস কালভো সেটাকে রেডিওয় পাঠ করে আমাকে সে যাত্রায় রক্ষা করেন ।  আজকের এই রবীন্দ্রোৎসব পালনের আন্তরিকতার কারণ খুঁজতে হলে আমাদের অনেকটাই ফ্ল্যাশব্যাকে যেতে হবে--- ১৯১৪ সাল নাগাদ স্পেনের সাহিত্য অনুবাদিকা সেনোবিয়া কামপ্রুবির হাতে প্রথম আসে গীতাঞ্জলির ইংরাজী অনুবাদ, তিনি মুগ্ধ হন, তারপরই 'দ্য ক্রিসেন্ট মুন' পড়ে অভিভূত হয়ে পড়েন, এর নিসর্গজগৎ, এর শিশুর মধ্যে এমনভাবে এক বিশ্বজগৎ লুকিয়ে আছে যা তাকে মুগ্ধ করেছিল । এমন কাব্য স্পেনের কবিতার ইতিহাসে নেই, অথচ এর সব উপাদান চারপাশে ছড়ানো । ওই বছরই 'দ্য ক্রিসেন্ট মুন' এর স্প্যানিশ অনুবাদ করে তার পান্ডুলিপি দেখান কবি হুয়ান রামোন হিমেনেথ যাঁর কবিতার সাথে তিনি মিল খুঁজে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যদৃষ্টিতে, নিসর্গের প্রতি আকর্ষণে, জীবনের রহস্যের প্রতি আসক্তিতে । তিনি গদ্যে অনুবাদ করবেন এই শর্তে পান্ডুলিপি দেখে সেনোবিয়াকে সাহায্য করতে এলেন, ধীরে ধীরে
রবীন্দ্রনাথ প্রবেশ করলেন তাঁর মনে, যার প্রমাণ 'দ্য ক্রিসেন্ট মুন' এর ভূমিকা-কবিতা, ১৯১৫য় বেরোলো সেই বই যা সমস্ত ইস্পানিয় স্পেনীয় জগতে আলোড়ন তুলে দিল, রবীন্দ্রনাথ প্রবেশ করলেন দুঃখজর্জরিত মানুষের মনের অন্তঃপুরে, ১৯১৫ থেকে ১৯২২ এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ২০টি বই অনুবাদ করেন তাঁরা, যাতে কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস এবং কিছু প্রবন্ধও ছিল । হুয়ান রামোনের লেখা একটি নোট পাওয়া গেছে, রবীন্দ্রনাথের অনুবাদকর্ম
সম্মন্ধে তাঁর ভাবনা:"তাঁর সমগ্র রচনা অনুবাদ করার অর্থ হল ওই কাজে সমগ্র জীবন উৎসর্গ করা ।" তাই, হুয়ান রামোন আর সেনোবিয়া, এই কবি-দম্পতি (রবীন্দ্রনাথের কবিতাই যাঁদের ভালবাসার বন্ধনে নীরব দৌত করেছিল আর স্পেনীয় সাহিত্যজগতে জন্ম দিল এক স্মরণীয় ঘটনার এবং রবীন্দ্রচর্চার ইতিহাসের ।) বাকি জীবন রবীন্দ্রনাথের লেখার অনুবাদ সমগ্র স্প্যানিশভাষী দেশগুলিতে অমর হয়ে রইলেন, এই অনুবাদকর্মই হুয়ান রামোনকে ১৯৫৬তে এনে দিল নোবেল পুরস্কার । ১৯১৫ থেকে লেখা তাঁর নিজের কাব্যগ্রন্থগুলিতেও রবীন্দ্রপ্রভাব স্পষ্ট । সেনোবিয়া এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন, আপনি আমাদের আত্মার সহচর । ৪০ বছর ধরে রবীন্দ্রচর্চায় নিয়োজিত জীবনেই তা প্রমাণিত । 'দ্য ক্রিসেন্ট মুন' সাফল্যের পর থেকে হিমেনেথ-সেনোবিয়াকৃত রবীন্দ্রনাথের অনুবাদকর্মগুলি এইরকম: ১৯১৭য় 'এল খারদিনেরো' ( দ্য গার্ডেনার), 'এল কারতেরো দেল রেই' ( ডাকঘর), 'পাখারোস পের্দিদোস'
(স্ট্রে বার্ডস) এবং 'লা কোসেচা' ( ফ্রুট-গ্যাদারিং) । ১৯১৮য় আরো ৭টি বই: 'এল আসেন্তা'
( সানিসাই), 'এল রেই ই লা রেইনা'( রাজা ও রানী), 'মালিনী', 'ওফেরতা লিরিকা'
(গীতাঞ্জলি), 'সিক্ল দে লা প্রিমাবেরা' (দ্য সাইকেল অফ স্প্রিং), 'লাস পিয়েদ্রাস আম্ব্রিয়েন্তাস ই ওত্রোস কুয়েন্তোস' ( ক্ষুধিত পাষাণ ও অন্যান্য গল্প) । ১৯১৯এ 'এল রেই দেল সালোন ওসকুরো' ( দ্য কিং অফ ডার্ক চেম্বার), 'সাকৃফিসিও' ( স্যাকৃফাইস), 'রেগালো দে আমান্তে'
( লাভার্স গিফ্ট), চিত্রা, 'মোরাদা দে পাস' (শান্তিনিকেতন), ১৯২০তে 'মাসি ই ওত্রোস কুয়েন্তোস' (মাসি অ্যান্ড আদার স্টোরিজ), 'ত্রানসিতো' ( ক্রসিং), ১৯২১এ 'লা এরমানা মাইয়োর ই ওত্রোস কুয়েন্তোস' (দ্য এলডার সিস্টার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ), ১৯২২এ 'লা
ফুখিতিভা' (দ্য ফিউজিটিভ), ১৯৩৬এ ছোটোদের জন্য রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গল্পের সংকলন: 'ভের্সোস ই পোয়েমাস পারা নিনিয়োস', ১৯৫৫য় রবীন্দ্ররচনাসমগ্র 'ওব্রা এস্কোখিদা'
এবং তাঁদের মৃত্যুর পর ১৯৬৪তে নৌকাডুবি। এই অনুবাদের হাত ধরেই সমগ্র মধ্য ও দক্ষিণ
আমেরিকায়  রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলোড়ন ওঠে। চিলেতে ১৯১৫ থেকে ১৯২০এর মধ্যে রবীন্দ্রপ্রভাব বেশ উঁচুতে ওঠে, রবীন্দ্রানুরাগীদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়া ছিলেন ১৯৪৫এ নোবেলজয়ী কবি গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল। ১৯৩১এর জানুয়ারীতে নিউ ইয়র্কে রবীন্দ্রনাথের চিত্রপ্রদর্শনীতে রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়, তার অনেক আগেই ১৯২২এ তাঁর
'দেসোলাসিওন' কাব্যগ্রন্থে 'কোমেন্তারিওস আ পোয়েমাস দে রবীন্দ্রনাথ তাগোরে' নামক তিনটি কবিতা লেখেন, ১৯৩১এর সাক্ষাতের পর বুয়েনোস আইরেসের 'লা নাসিওন' পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে 'গোরে দে নুয়েভা ইয়র্ক' নামে এক প্রতিবেদন লেখেন। সেই প্রতিবেদনের শেষ কয়েকটি লাইন: " বিদায় সম্ভাষণ প্রত্যর্পণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে, এমনভাবে যা মনে হয় আমি সামাল দিতে পারি না... আমার মধ্যে আছে শ্রদ্ধার অতিরেক, কিন্তু আমার হাঁটু দুটো মুড়বার পক্ষে বড়ই কষ্টকর আর আমি তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিই, আমার তালুতে অনুভব করি সেই সুন্দর শুভ্র কেশরাশি যা ইতিপূর্বে আমার কাছে মহিমান্বিত হয়ে গেছে।"
তাঁর সমকালিন স্পেনীয় কবি রাফায়েল আলবের্তি তাঁর 'মারিনেরো এন তিয়েররা' ( মাটির নাবিক) কাব্যে একটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধার্পণ করেছেন। আর চিলের বিশ্ববন্দিত কবি পাবলো নেরুদা 'ভেইনতে পোয়েমাস দে আমোর ই উনা কানসিওন দেসেসপেরাদা'
(কুড়িটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান) কাব্যে ১৬তম কবিতাটি আসলে রবীন্দ্রনাথের
'মানস প্রতিমা'র অনুবাদ। তাই ইস্পানিয় স্পেনীয় পাঠকজগতে রবীন্দ্রনাথের বিপুল জনপ্রিয়তা কেন, তা সহজেই অনুমেয়। আর আর্হেন্তিনায় তাঁকে রাজার বসানো হয় আজও।
আর্হেন্তিনীয় কবি ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই নিজের লেখার চেয়ে অন্য কবি-শিল্পীদের পাদপ্রদীপে আনার কাজেই ব্যাপৃত থেকেছেন, হিমেনেথ-মিস্ত্রাল-নেরুদার অনুবাদে তিনি আকৃষ্ট হন। তাঁর আমন্ত্রণেই ১৯২৪এ রবীন্দ্রনাথের আর্হেন্তিনায় যাওয়া, কবিতাপাঠ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ভিক্তোরিয়া এবং তাঁর বোন লেখিকা সিলভিনা এরপর রবীন্দ্রনাথের অননুদিত কবিতার অনুবাদ শুরু করেন। বাঙালি পাঠকরা ইতিমধ্যে রবীন্দ্রনাথ-ভিক্তোরিয়া প্লেটোনিক ভালবাসা নিয়ে অনেক লেখাই পড়েছেন, রবীন্দ্রনাথের বিজয়া যে আসলে ভিক্তোরিয়াই, তার অনুমানেরও দরকার হয় না। রবীন্দ্রনাথ 'পূরবী' লিখেছিলেন ভিক্তোরিয়াকে নিয়েই। অতিসম্প্রতি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত স্প্যানিশ ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ডঃ শ্যামাপ্রসাদ গাঙ্গুলি রবীন্দ্রনাথের ব্যবহার করা চশমা, পেন, কবিতার বই যা তিনি পেয়েছিলেন ভিক্তোরিয়ার সহায়তাকারী মারিয়া রেনে কুরার থেকে, তা সবই তুলে দিয়েছেন বিশ্বভারতীর হাতে। ১৯৩০এর ২রা মে প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের ১২৫টি ছবি নিয়ে যে চিত্রপ্রদর্শনী হয়, তার ব্যাবস্থাপনায় ছিলেন ভিক্তোরিয়াই। এবং ফ্রান্সের কড়া হাকিমের দরবারে রবীন্দ্রনাথের ছবি মহাসমাদর পায়।
ইস্পানিয় স্পেনীয় জগতে রবীন্দ্রনাথ আজও কতটা পঠিত, তাতো শুরুতেই বলেছি। ১৯৮৫ সালে হোসে লোপেজ মার্তিনেজ তাঁর 'এন এল মার রিহরোসো দে লা মুয়েরতে' ( মৃত্যুর কঠিন সমুদ্রে) কাব্যে 'তোমার শব্দের পদচিহ্ন ধরে' কবিতাটি লেখেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে:
'তোমার শব্দের পদচিহ্ন ধরে
এই কালস্রোতে তোমায় খুঁজি
একা একা হাঁটতে হাঁটতে
ক্রমশঃই বুঝি
তুমি শাশ্বতের
উৎসধারা। '

তথ্যসূত্র:
১) শাশ্বত মৌচাক:রবীন্দ্রনাথ ও স্পেন- ডঃ শ্যামাপ্রসাদ গাঙ্গুলি, ডঃ শিশিরকুমার দাশ
২) যুগলবন্দী স্পেনীয় ও ভারতীয় সাহিত্য- রবিন পাল
৩) অন্যদেশের কবিতা- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
৪) রেকুয়েরদোস- ফ্রান্সিসকো গারসিয়াস

৫) আলফ্রেদো পেরেস আলেনকার্ত- সালামানকা, স্পেন

আমার অনুবাদ কবিতা

সম্প্রতি অচেনা যাত্রী পত্রিকার  মে মাসের দশম সংখ্যায় আমার করা এই  অনুবাদ কবিতাগুচ্ছ প্রকাশিত হয়েছে, প্রিয় পাঠক, আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম:

কবি: দিয়েগো দামিয়েন ওইয়েরো
দেশআর্হেন্তিনা
ভাষা: স্প্যানিশ
অনুবাদমৈনাক আদক
কবি-পরিচিতি: শূন্য দশকের আর্হেন্তিনীয় কবি দিয়েগো দামিয়েন ওইয়েরোর জন্ম ১৯৮১ সালে রাজধানী বুয়েনোস আইরেসে পেশায় অভিনেতাচিত্রনাট্যকারপরিচালক,গল্পকার এবং ভাস্কর 'এল দোক্তোর ক্লোক'ছদ্মনামে ইতিমধ্যে আর্হেন্তিনীয় কল্পবিজ্ঞান আর রহস্যরোমাঞ্চমূলক ছবিতে অভিনয় করেছেনকাজ করছেন নাটকেও আর্হেন্তিনায় বিভিন্ন সাহিত্যসভায় কবিতাপাঠ করেন আন্তর্জাতিক আন্তর্জাল পত্রিকা 'লাকবেরনা'র সম্পাদকবর্তমানে 'লা কাসা দে মুন্দো ক্লোকনামক রহস্যরোমাঞ্চমূলক সাহিত্যপত্রের সম্পাদনা করেন

ক্রাকেন

প্রবেশপথ
এই অন্ধকার ক্ষুধা
যে ক্ষইয়ে দেয় মন
 সমুদ্রের গভীরে

চাঁদ ডাকাডাকি করে তোমার দরজায়
ওখানে সে ভেসে যায় মৃতদেহের স্তূপ পেরিয়ে
অনন্তকালকে টেনে নিয়ে আসে
 জাহান্নাম থেকে তোমার দিকে

তরঙ্গ
থাবায় আলিঙ্গনাবদ্ধ সময়

যখন

তোমার দৃষ্টিতে পাচিত হয়ে যায় ওরা

সেই দিন
বেঁচে থাক তোমার অ্যালার্মঘড়ি

ঢেকে ফালো আগুনের আদ্রতায়

কেননাএখন খাবার সময়
(ক্রাকেন এক কাল্পনিক পশুআর্হেন্তিনীয় পুরাণ মতেক্রাকেন সমুদ্রের নরকে রাজত্ব করত)

দড়ি

দড়িরক্তের ব্রার অস্তিত্বের শস্য
কে যেন বলেছিলঅন্ধকার আমার ছাত্রী
মেঘ আর রাস্তা আমাকে টেনে আনে তোমার মৃত্যুর দিকে
আমার খাদ্য পরিবর্তনের জন্য
শিরার শিশিরপুঞ্জ হঠাৎ বিস্ফোরিত
যখন টর্চের আলোয় ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলা
যখন এই ধারালো হিমশৈল হাড়পাঁজরা ভেদ করে যায়
ভেঙে দেয় আমার নীরবতা পাহাড়িয়া প্রতিধ্বনিতে
শেষের এই শব্দমালা
ওরাই আমার মনের রাস্তা
আর আমার শরীর নিঃসঙ্গতাকে শূন্য করে চলে যায়
রয়ে যায় হাতের ভাঁজে

আনন্দ

পরিষ্কার করা হচ্ছে
      জানালার ঘাম
           অস্তিত্বের মলিন মুখ দিয়ে
যখন
     তুমি নাচো শয়তানের সাথে
           আধো অন্ধকারে

সাইউমব্রের অনাসৃষ্টি

শব্দের  গন্ধ
     জেগে ওঠে        অন্ধকারের নৈঃশব্দ
              যেখানে শব্দ
                  অতিক্রম করে ক্লাইম্যাক্স
মৃত্যুর উদরে
        ঈশ্বর          ভার্চুয়াল পুরুষ
                 স্পর্শ করে       রক্ত
                         সৃষ্টি করে
                              বিস্ফোরণের অ্যান্ড্রয়েড
তারপর
            চিন্তনকে সংযুক্ত করে
      মহাশূন্য বিভাজনে

দৃষ্টি

চোখ
ভেঙেচুরে যায় জানালা থেকে জানালায়
আনত
বাচ্চা মেয়েটাকে মেপে নেয় আপাদমস্তক
            জলের ফোঁটা
পিছলে যায় পাখির
মার্বেলসম ডানায়
সুবাস ছড়ায় তোর চুলে
আর আমি অন্ধকারের ভিড়ে হারিয়ে যাই
            উড্ডীয়মান মন

নীরব মৃত্যুর পুনরুত্থান

বেঁচে আছে
       কণ্ঠহীন মানুষ
              খুঁজে বেড়ায় ছাত্রদের হাড়গোড়
পার্থিব যন্ত্রপাতির মাঝে

                      বিষ প্রয়োগ করে
                              শয়তানের হাতে সমাধিস্ত আলো
                    যখন                 শুরু হয়
                         ডাইনিদের বহ্ন্যুৎসব
কে যেন বলল
                সময়ের বর্মে সজ্জিত রক্ত
                                  গিলে খায় অন্ধকার
                                                 ঝড়ের অবয়ব

যেখানে
       আর্তনাদ পূতিগন্ধময়
     তড়িতাহত জীবকোষ
   রাতের বিষদাঁতে

তাঙ্কা

নদীর পাপড়ি
চাঁদ জাগিয়ে তোলে
সুবাসহীন গ্রীষ্মের
শয়তানকে

হাইকু

আত্মা
ঠান্ডা মহাসাগর
দেখায় সূর্য